ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের স্থলবেষ্টিত সাত রাজ্য (সেভেন সিস্টার্স) ও নেপাল-ভুটানে ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণের বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের একটি মন্তব্য নিয়ে নানা আলোচনার প্রেক্ষাপটে তার হাই রিপ্রেজেনটেটিভ (বিশেষ দূত) ড. খলিলুর রহমান বলেছেন, বাংলাদেশ কানেক্টিভিটি কাউকে জোর করে চাপিয়ে দেবে না। কেউ নিলে খুব ভালো, না নিলে কিছু করার নেই।
বুধবার (২ এপ্রিল) অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের থাইল্যান্ড সফর ও বিমসটেক সম্মেলনে যোগদান উপলক্ষে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। বাংলাদেশ ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে সংবাদ সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয়।
সাম্প্রতিক চীন সফরে সেদেশের বিনিয়োগকারীদের সামনে প্রধান উপদেষ্টার এক বক্তব্যে সেভেন সিস্টার্স প্রসঙ্গ নিয়ে ভারতের নীতি-নির্ধারকদের মধ্যে তোলপাড় চলছে। ওই বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘নেপাল ও ভুটান স্থলবেষ্টিত দেশ, যাদের কোনো সমুদ্র নেই। ভারতের সাতটি উত্তরপূর্ব রাজ্যও স্থলবেষ্টিত। আমরাই এই অঞ্চলের জন্য সমুদ্রের একমাত্র অভিভাবক। ’ তিনি এসব দেশের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের ওপর জোর দেন, যা বাণিজ্য বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।
ওই বক্তব্য নিয়ে ভারতীয় নেতাদের প্রতিক্রিয়া প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে হাই রিপ্রেজেনটেটিভ বলেন, এই কথাটি প্রধান উপদেষ্টা প্রথমবার বলেননি, অনেকে ২০১২ সালে একই ধরনের কথা বলেছিলেন। এর চাইতে একটু এগিয়ে গিয়ে ২০২৩ সালে জাপানের প্রধানমন্ত্রী কিশিদা দিল্লিতে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, নর্থইস্ট ইন্ডিয়া এবং বাংলাদেশ একটা ভ্যালুচেইনে আবদ্ধ করা এবং উনি এই প্রসঙ্গে সিঙ্গেল ইকোনমিক জোনের কথাও বলেছিলেন। কানেক্টিভিটি এই অঞ্চলের সম্ভাবনার দুয়ারটা খুলে দেবে। বিশেষ করে যাদের জন্য সমুদ্রে অ্যাকসেস পাওয়াটা খুব কঠিন। আমরা কিন্তু কানেক্টিভিটি জোর করে চাপিয়ে দেব না। দেওয়ার অবস্থা আমাদের নেই। কেউ যদি নেন খুব ভালো, আর না নিলে কী করবো আমরা, কিছু করার নেই।
খলিলুর রহমান বলেন, অত্যন্ত সৎ উদ্দেশ্য নিয়ে তিনি (প্রধান উপদেষ্টা) ওই কথা বলেছেন। এখন যদি এর ব্যাখ্যা অন্যরকম দেওয়া হয়, আমরা তো সেই ব্যাখ্যা ঠেকাতে পারছি না। আমরা শুধু এটুকু বলতে পারব যে, আমরা কানেক্টিভিটি সবার ইকুইটেবল বেনিফিটের জন্য দিতে আগ্রহী আছি। কেউ নিলে তো ভালো, না নিলে নেবে না।
সাংবাদিকদের আরেক প্রশ্নের উত্তরে খলিলুর রহমান বলেন, আঞ্চলিক জোটগুলো যে কাজটা করে সেটা হলো জোটভুক্ত দেশের শক্তিগুলোকে এক জায়গায় করে বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের প্রচেষ্টা চালায়। আমাদের এই অঞ্চলে কানেক্টিভিটি একটা প্রধান বিষয়। আঞ্চলিক যোগাযোগ আঞ্চলিক সহযোগিতা ছাড়া করা সম্ভব নয়। দ্বিতীয়ত এই মুহূর্তে আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে যে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে সেটাও এই অঞ্চলের কোনো দেশ, বিশেষ করে ছোট ছোট দেশগুলোর এককভাবে মোকাবিলা করা অত্যন্ত কঠিন। আপনি যখন জোটবদ্ধভাবে এ সমস্যাগুলো সমাধানের চেষ্টা করবেন, সমস্যা সমাধানের সম্ভাবনাটাও সেই পরিমাণ বাড়বে। আপনাকে আশাবাদী থাকতেই হবে, এটা সত্য ২৫ বছর বিমসটেকে আমরা উল্লেখযোগ্য ফুটপ্রিন্ট দেখতে পাইনি। কিন্তু এই বছর প্রথমবারের মতো কিছু ফোকাস এরিয়া এবং সেগুলো প্র্যাকটিক্যাল, ফোকাস এরিয়াগুলো নির্দিষ্ট হয়েছে। আমাদের প্রচেষ্টা থাকবে আগামী দিনগুলোতে এগুলোকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বাস্তবসম্মত একটা কার্যক্রম তৈরি করা। আমরা আশা বজায় রাখবো বিমসটেক তার রোলটা প্লে করবে।
সাংবাদিকদের আরেকটি প্রশ্নের উত্তরে হাই রিপেজেন্টেটিভ বলেন, প্রধান উপদেষ্টা চীন সফর করছেন কিংবা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে তার বৈঠকের সম্ভাবনা আছে, এগুলো কিন্তু ‘জিরো-সাম গেম’ নয়, যে এক জায়গাতে গেলে অন্য জায়গায় আমাদের সম্পর্ক নষ্ট হবে। আমরা সব জায়গায় গিয়ে আমাদের সুবিধা অনুযায়ী, পারস্পরিক সুবিধা অনুযায়ী যতটুকু এগোতে পারে আমরা সেই চেষ্টা করব। সেই কারণে আমরা সব দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে চাই। কাউকে বাদ দিয়ে আমরা এগোতে চাই না।
সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে খলিলুর রহমান বলেন, প্রধান উপদেষ্টা আগামীকাল ৩ এপ্রিল ও ৪ এপ্রিল ষষ্ঠ বিমসটেক সম্মেলনে যোগ দিতে ব্যাংকক যাচ্ছেন। সম্মেলনে অংশগ্রহণ ছাড়াও তিনি অন্যান্য কয়েকটি অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন। এই সম্মেলনের শেষের দিন একটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটবে। তার মানে আগামী চেয়ারম্যানশিপ অব বিমসটেক অর্পিত হবে আমাদের প্রধান উপদেষ্টার হাতে এবং বিমসটেক পরিচালনার একটা প্রধান ভূমিকা এই সময় থেকে বাংলাদেশ পালন করে আসবে। এই সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টা বিমসটেক-এর বিভিন্ন রাষ্ট্রের সরকারপ্রধানদের সঙ্গে আলোচনা, দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করবেন। পরশু দিন (শুক্রবার, ৪ এপ্রিল) প্রধান উপদেষ্টা ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেবেন।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেসসচিব শফিকুল আলম, উপ-প্রেস সচিব মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ মজুমদার।